বিশ্ববাণিজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি একটি অবৈজ্ঞানিক অর্থনৈতিক নীতি বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ট্রাম্পের এ অর্থনীতি টিকবে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘মার্কিন অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে তার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে অর্থনীতিতে যে পরিবর্তনগুলো হওয়া দরকার সেগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। শুধু চীন নয় পুরো দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে তার মার্কেট হারাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি টুইন ডেফিসিট আছে। একটি হচ্ছে তার চলতি হিসাবে ডেফিসিট এবং আরেকটি হচ্ছে আর্থিক খাতের ডেফিসিট। এ দুটি ডেফিসিটের ফলাফল শেষে তার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও তার অন্যান্য রাজস্ব আহরণকে প্রভাবিত করেছে। এটার সমাধান হিসেবে ট্রাম্প ট্যারিফ বাড়িয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মাধ্যমে সে মনে করছে তার দেশে অন্যরা ব্যবসা করতে পারবে না, উপরন্তু তার বিনিয়োগ অন্য দেশে বাড়বে, কর্মসংস্থানও বাড়বে। ট্রাম্পের এ নীতি যদি সফল হয় তাহলে টেক্সট বই নতুন করে লিখতে হবে। এটা সম্পূর্ণ ভূল অর্থনীতি। এ অর্থনীতি টিকবে না। কারণ এটি অবৈজ্ঞানিক। আগামী ৬ মাস পর তারা বুঝতে পারবে।’
রোববার (২০ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে প্রথম আলো আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ‘এখন ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্কের বিষয়ে সমঝোতা করতে হলে আমাকে তার ডেফিসিটটা মাথায় রেখে করতে হবে। তার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান। তার নীতিতে ভোক্তার বিষয়টি তিন নম্বরে। এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে এটা শুধু শুল্ক নয়। এর সঙ্গে অশুল্ক অনেক কিছু যুক্ত। অর্থনীতির সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিও আছে। যারা শুল্ক হিসেবে দেখছেন তারা এটা ঠিক দেখছেন না।’
এ পরিস্থিতি উত্তরণে বাংলাদেশ সরকারের একটি ফ্রেমওয়ার্ক দরকার জানিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এ শুল্ক মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের একটি বড় ফ্রেমওয়ার্ক দরকার। শুল্ক দিয়ে সমাধান করলে সর্বোত্তম সমাধান পাওয়া যাবে না। এটার জন্য আগামী দিনে বাংলাদেশ কোথায় থাকবে সে চিন্তাটা বৃহত্তর পরিসরে করা দরকার। এটার জন্য দরকার বৈচিত্র্যতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।’
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় সরকারের দুর্বলতার সমালোচনা করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘কোনো দুর্বল সরকার সফল সমঝোতা করেছে এমন নজির খুব কম। অসমন্বিত সরকার তার সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পেরেছে এমন উদাহরণ নাই। এমন সরকার যে তার নেতৃত্বে আছে কিনা সেটা বোঝা যায় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো বিভাগ এখানে নাই। এটি একটি দুর্বলতার অংশ। এ দুর্বলতা পূরণ করার জন্য অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে আসা দরকার। এদেশে অনেক সম্পদ আছে সেগুলো এখানে যুক্ত করা যায়। সেগুলো ব্যবহার করছে তাই বলছি এ সরকার একটি নির্দোষ সরকার।’
গোলটেবিল বৈঠকে হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত ৪০ বছর ধরে ব্যবসায় রফতানি খাতে এমন সংকট কখনো দেখিনি। আমরা ব্যবসায়ীরা এ খাতকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন হতাশ ও ক্ষুব্ধ।’
এ কে আজাদের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের এ অবস্থায় আস্থা পাচ্ছে না জানিয়ে বলেন, আমার এক বড় ব্র্যান্ড হেড অফিসে ডেকে জানায়, তারা নিজ দেশের সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেছে। তাদের ভাষ্য ছিল—তোমাদের অবস্থান দুর্বল, ভালো ফল আশা করা যাচ্ছে না।’ এটা শুনে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ দেয়ার পর স্থগিত করেছে। তারা এখন ধীরেসুস্থে কাজ দিতে চায়। এমনকি তারা এও জিজ্ঞেস করছে, যদি ট্রাম্পের নতুন পাল্টা শুল্ক আরোপিত হয়, তোমরা (বাংলাদেশী রফতানিকারক) তার কত ভাগের দায় নিতে পারবে।’ কিন্তু বিষয়টি হলো, বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা খুবই কম মুনাফায় কাজ করেন। এই বাস্তবতায় ৩৫ বা ৩২ শতাংশ শুল্কের ভাগ বহন করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির, নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মাহবুব আহমেদ, প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান।